রাষ্ট্রপতির কাছে যাবেন খালেদা, ফল কী হবে? আপডেট: 17-12-2016   

২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া l ফাইল ছবিরাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয়। দেশের গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের আশা আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হোক। তবে তাদের মনে এই ভয়ও আছে যে, অতীতে আলোচনার টেবিলে খুব কম প্রশ্নের ফয়সালা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি জনগণের মনের ভাষা উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে তাদের অকুণ্ঠচিত্তে অভিবাদন জানাব, আর যদি অপারগ হয়, বুঝতে হবে জাতির কপালে আরও অনেক দুর্ভোগ আছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন গঠনকল্পে ১৩ দফা রূপরেখা দিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জানানো হয়, তিনি নিবন্ধিত সব দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। প্রথম পর্যায়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জাসদকে (ইনু) আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগামীকাল ১৮ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দল। আসলে আলোচনাটি সরাসরি সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে হওয়াটিই ছিল উত্তম। গণতান্ত্রিক দেশে সেটাই হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিবেশ আছে বলে মনে হয় না। এর আগে বিএনপি সরকারি দলের প্রতি আলোচনার আহ্বান জানালে আওয়ামী লীগের নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, জামায়াতের দোসর বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত রেখেছে। আর আদালত জানিয়ে দিয়েছেন, দাঁড়িপাল্লা কোনো দলের প্রতীক করা যাবে না (শুরু থেকে দাঁড়িপাল্লাই ছিল জামায়াতের দলীয় প্রতীক)।

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বলে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘তিনি যে সিদ্ধান্ত দেন সেটা আমরা মেনে নেব।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অনেকে সমঝোতার সবুজসংকেত বলে মনে করেন। আবার কারও মতে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে ফায়দা হবে না। আসল চাবি সরকারের হাতে।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির এটাই প্রথম আলোচনা নয়। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বরে যখন দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অগ্নিকোণে ঝড় বইছিল, তখনো খালেদা জিয়া জোটের নেতাদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিল, যাতে জামায়াতের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির নাজির আহমদও ছিলেন। এবার তিনি বিএনপির ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। জোটের শরিক কেউ থাকবেন না। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের আমন্ত্রণে বিএনপির নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। দুবারই তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে অনড় ছিলেন। এবার তাঁদের মুখ্য দাবি যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক। 

২০১৩ সালের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নেওয়া যেতে পারে পত্রিকার পাতা থেকে। ২০ ডিসেম্বরের যায়যায়দিন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোটের ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় এক ঘণ্টা। বৈঠকে জোটপ্রধান তাঁর দলের অবস্থান জানিয়ে লিখিত বক্তব্য দেন।’ বৈঠক শেষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব এহসানুল করিম (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব) সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৮ দলীয় জোট নেতারা চলমান সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, কোনো সরকারই অতীতে সংবিধানে এমন কোনো বিধান রাখেনি, যাতে কোনো সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতি ভূমিকা রাখতে পারেন।’ রাষ্ট্রপতির মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯১ সালে যখন দেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় পুনরায় ফিরে এল, তখন প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ রাখা হলো। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কবর জিয়ারত ও মিলাদ মাহফিলে যোগ দেওয়া ছাড়া তাঁর কোনো কাজ নেই।’ সংবিধান অনুযায়ী সব কাজই তাঁকে করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে।

পৃথিবীর সব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীই নির্বাহী ক্ষমতার মালিক। অথচ তিনি জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ নন, দায়বদ্ধ পুরো মন্ত্রিসভা। অর্থাৎ ক্ষমতাহীন হয়েও মন্ত্রীরা দায়বদ্ধ। আবার যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনিই সংসদ নেতা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনেক ভালো নীতি ও বিধানের কথা থাকলেও ৭০ ধারার মাধ্যমে সাংসদদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হয়েছে। কোনো সাংসদ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে এমনকি কথা বলতেও পারেন না। ২০১২ সালে যখন রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার বিপক্ষে শক্ত যুক্তি তুলে ধরেও ১৪ দলের শরিক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদেরাও পঞ্চদশ সংশোধনীতে সই দিতে বাধ্য হন। তখনো পর্যন্ত তাঁরা সরকারের অংশীদার না হলেও ভোট দিতে বাধ্য হলেও নৌকার সহযাত্রী ছিলেন। বায়াত্তরের সংবিধানে বর্ণিত সংসদীয় ব্যবস্থার পুরোটাই বিএনপি লুফে নিয়েছিল এই ভরসায় যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেও রাষ্ট্রপতি পুরো ক্ষমতা ভোগ করবেন। গত ২৫ বছর সেই ধারাবাহিকতা চলছে।

আমরা রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কথা না বলার চেয়ে কথা বলা ভালো। দীর্ঘদিন সভা-সমাবেশ করার অধিকার বঞ্চিত বিএনপির নেতারা অন্তত মনের কথাগুলো রাষ্ট্রপতিকে বলে আসতে পারবেন। বিএনপির প্রধান নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে ১৩ দফা দাবি পেশ করার পর থেকেই তারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে আসছিল। বিএনপির দাবি বা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি ত্বরিত সাড়া দিয়েছেন, অনেক দুঃসংবাদের মধ্যে এটি সুসংবাদ হতে পারে। কীভাবে? প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীতের বৈরিতা ও অবিশ্বাস দূরে ঠেলে দিয়ে খোলা মন নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ‘সালিস মানি তালগাছটি আমার’ এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নির্বাচন কমিশন অবশ্যই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তরিক হলে ১৬ কোটি মানুষের মধ্য থেকে সিইসি বা ইসি পদে পাঁচজন যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে দুই দলেরই দায় আছে। ক্ষমতাসীন হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়টা হয়তো বেশি। কিন্তু বিএনপিকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিএনপির রাজনীতি শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ বিরোধিতা দিয়ে। এখন আর বিরোধিতার রাজনীতি কল্কে পাবে না। গত আড়াই দশকের ক্ষমতার পালাবদলে ও সমীকরণে কে কার থেকে কী নিয়েছে, সেটি হিসাব-নিকাশ করে দেখতে হবে। মুখে যে যাই বলুন না কেন দুটি দলের মধ্যে ফারাকটি ক্রমেই কমে আসছে। একসময় আওয়ামী লীগ বিএনপির যেসব নীতির বিরোধিতা করত, এখন সেগুলো দলের অলিখিত নীতি হিসেবে নিয়েছে। আবার আওয়ামী লীগেরও অনেক নীতি বিএনপি আত্মস্থ করেছে। পেশিশক্তি লালন ও কালোটাকা পালনের বদনাম দুই দলের গায়েই লেগেছে।

রাষ্ট্রপতির আলোচনার উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা তাঁর ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর। অন্যরা নিজ নিজ দল ও জোট প্রধানের নামে কোরাস গাইবে। বিএনপি বলেছে, সার্চ কমিটিতে তাদের তালিকা থেকে অন্তত দুজনকে নেওয়া হোক। আমরা যদি ধরে নিই পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি হবে, বাকি তিনজনের নাম ক্ষমতাসীন জোট ও দল দিতে পারে। উভয় পক্ষের সমঝোতামাফিক সার্চ কমিটি হলে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাথাব্যথাও কমবে। সার্চ কমিটিই ঠিক করবে কে সিইসি ও কারা কমিশনার হবেন। সার্চ কমিটি যদি ১০টি নাম দেন (গতবারও যেভাবে দেওয়া হয়েছিল) রাষ্ট্রপতি তার থেকে পাঁচজনকে বেছে নেবেন। এবার দাবি উঠেছে নির্বাচন কমিশনার পদের মধ্যে একজন নারীকে নেওয়া হোক। অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। আশা করি, বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি এসেছে বলে আওয়ামী লীগ নাকচ করে দেবে না।

কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশন গঠন নয়। নির্বাচন কমিশনকে তার আইন ও বিধান অনুযায়ী কাজ করতে দেওয়া। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। নির্বাচন কালে দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা কী হবে—সেসব বিষয়ও একটি সমঝোতায় আসতে হবে। তিন জোটের রূপরেখার মতো যার সাংবিধানিক ভিত্তি না থাকলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকবে।

পুরো আলোচনায় অনুসন্ধান করতে হবে অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে কেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কেন অকার্যকর হলো, কেন নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে কখনো​ই রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারছে না। রাজনৈতিক বিবাদ সত্ত্বেও আশির দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কাছাকাছি আসতে পেরেছিল। ১৯৯১ সালে দুই দল মিলেই যত ভঙ্গুরই হোক, একটি সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেটি কেন কাজ করল না? বর্তমান সংসদে বিএনপি নেই, মানলাম। বিগত চারটি সংসদে (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬-২০০১, ২০০১-২০০৬, ২০০৯-২০১৪) তো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই ছিল। কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে। তারপরও সংসদ পুরোপুরি কার্যকর করা গেল না কেন? এর পেছনে নীতি না উগ্র ক্ষমতাবাসনা কাজ করেছে, যৌক্তিক আন্দোলন না গোঁয়ার্তুমি সক্রিয় ছিল—সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করি।

নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপি কাছাকাছি আসতে পারলে সুড়ঙ্গের শেষে মৃদু আলো দেখা যেতে পারে। অন্যথায় কী হবে কেউ বলতে পারে না।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

উৎসঃ প্রথমআলো