ট্রেন যাত্রাও এখন আর নিরাপদ নয় আপডেট: 01-06-2018   
ট্রেন যাত্রাও এখন আর নিরাপদ নেই সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল যখন লাগামহীন তখন নিরাপদ যাত্রা হিসেবে অনেকে ট্রেনকে ভাবেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেন দুর্ঘটনাও সমানতালে বেড়েই চলেছে। সেই সাথে বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের ৩৫০ কিলোমিটার রেলপথ কমেছে। এদিকে ২০১২ থেকে এ পর্যন্ত ট্রেনযাত্রীদের সেবার মানসহ রেলপথ বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ৬৪ হাজার কোটি টাকার বেশি রেলে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু একটি প্রকল্পও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। এতে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়। এমনকি ব্যয় ও সময় বাড়িয়েও অধিকাংশ প্রকল্প শেষ করা যায়নি। মূলত দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেই এত অর্থ খরচের পরেও সেবার মান বাড়েনি রেল যাত্রায়। অথচ আগের তুলনায় এখন যাত্রীদের প্রায় তিনগুণ ভাড়া গুণতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্ধশতাধিক প্রকল্পের নামে বিশাল বরাদ্দের অর্থ হরিলুটের মাধ্যমে মূলত রেলের ‘কালো বিড়াল এখন বেশ মোটাতাজা’ হয়েছে। যে কারণে রেলকে মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করেও কার্যত যাত্রীদের কোনো লাভ হয়নি। বরং রেলযাত্রীদের সেবার মান বাড়ার পরিবর্তে ভোগান্তি ও ভাড়ার পরিমাণই বেড়েছে। প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি কাটা বরাদ্দ ও যাত্রীদের টিকেটের দাম বাড়িয়ে কেবল খেয়ে-দেয়ে কালো বিড়ালই দ্রুত ফুলে-ফেঁপে মোটাতাজা হয়েছে। এছাড়া রেলযাত্রী বা রেললাইনের উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়নই হয়নি, বরং পথ আরো কমেছে। তারা বলছেন, রেল দুর্ঘটনা, সিডিউল বিপর্যয়, সিট ইত্যাদিসহ নেতিবাচক সবগুলো দিক আগের মতোই আছে। কিছু নতুন বগি সংযুক্ত হওয়ায় গুটিকয়েক ট্রেনে স্বস্তি মিললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেবার মান উল্টো কমেছে। ট্রেনের সিটে ছারপোকা, ছেঁড়া-ফাটা সিট, রাতে বাতি জ্বলে না, টয়লেটে আলো-পানি নেই, ফ্যানের পাখা ঘোরে না, বন্ধ হয় না জানালা, একবার বন্ধ হলে আর খোলে না, বিনা টিকেটের যাত্রীদের চাপে বসা দায়, হকার-পকেটমারের উৎপাত, ট্রেনে ক্যাটারিংয়ে মানহীন জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যসহ হাজারো সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর এসব সমস্যা দেখারও যেন কেউ নেই। একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীও। জানা গেছে, রেলের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকল্প নিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। অথচ গত ৬ বছরেও রেলওয়ের কোনো প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি। নিয়োগ, কেনা-কাটা, টিকেট বিক্রিসহ নানা বিষয়ে দুর্নীতি, নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, মন্ত্রণালয়ের গাছাড়া ভাব, মাঠে না থেকে অফিসে বসে রেল নিয়ন্ত্রণ, রেল বেসরকারিকরণ, মান্ধাতার আমলের লাইন মেরামত না করা, কর্মীর অভাবসহ নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতিতে ডুবেই চলছে জনসেবামূলক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি। যদিও রেলপথের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পৃথক রেলওয়ে মন্ত্রণালয় গঠন করে সরকার। এর পর প্রতিবছর রেল খাতে বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সেই থেকে গত ৬ বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে রেলওয়েতে। কিন্তু রেললাইন বেড়েছে সামান্যই। ব্যয়ের ক্ষেত্রে লাগামহীন দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। জানা গেছে, এ সময়ে গৃহীত হয়েছে মোট ৫৩টি প্রকল্প যার কোনোটিই যথা সময়ে শেষ হয়নি। ফলে প্রকল্পব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বস্তুত, লূটপাট প্রবণতার কারণেই এমনটি হয়েছে। কমেছে ৩৫০ কিলোমিটার রেলপথ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ বছরে দেশে ৩৫০ কিলোমিটার রেলপথ কমেছে। যদিও রেলকে এ সময়ে মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাত্র ১৬৪ কিলোমিটার রেলপথ। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইন করার অংশ হিসেবে টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার ও লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শুরু হতেই বিলম্ব হচ্ছে। কবে শেষ হবে তা বলা দুষ্কর। আর এ জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো অগ্রাধিকারভিত্তিক লাইনে সময়ও কমেনি। বর্তমানে সারাদেশে রেলপথ রয়েছে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ব্রডগেজ ৬৫৯ কিলোমিটার, মিটার গেজ ১ হাজার ৮৪৩ কিলোমিটার এবং ডুয়েল গেজ ৩৭৫ কিলোমিটার। গত তিন বছরে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় হাজার খানেক। আগের দুই অর্থবছর এ দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৫৪ ও ৩৭৭। কিন্তু কোনো একটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় শাস্তি হয়নি কারো। এদিকে রেলওয়ের উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের আমলে নেয়া ৫৩টি প্রকল্পের মধ্যে ২৬টিরই বাস্তব অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সবগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়। কোনো কোনোটায় ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। অপরদিকে, রেলওয়ের সম্পন্ন করা তিনটি প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ২১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তারাকান্দি-বঙ্গবন্ধু সেতু সংযোগ (৩৫ দশমিক ১২ কিলোমিটার) রেলপথ নির্মাণে ২৮ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার ১০৮ টাকা আত্মসাৎ করেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের ৭৪ কোটি ২৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৫০ টাকার দরপত্র অনুমোদন করা হয়। মহাহিসাব নিরীক্ষকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষায় এ দুর্নীতি প্রমাণিত হয়। ২০১১ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ সংস্কার প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এ প্রকল্পের অনিয়ম তদন্ত করছে সিএজি। মহাহিসাব নিরীক্ষকের (সিএজি) নিরীক্ষা সূত্রে জানা গেছে, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ১১টি মিটার গেজ ইঞ্জিন কেনায় রেলের গচ্চা গেছে ১৮০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ৩০০ কোটি টাকা হলেও রেলওয়ে এ ক্ষেত্রে ব্যয় করেছে ৪৮০ কোটি টাকা। এ ছাড়া নিরীক্ষাপত্রে আরো বলা হয়েছে, নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, পুরাতন লাইন মেরামত না করা, লাইনে পাথর না থাকা, রেলগেটগুলোতে গেটম্যানের অভাব, যত্রতত্র রেলগেট নির্মাণ, সাবেক ড্রাইভার, গার্ডসহ নানা ক্যাটাগরির কর্মী দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে রেল। প্রকল্পে দুর্নীতি, ঘুষ, প্রকল্প পরিচালকদের অর্থ আত্মসাৎ, মান্ধাতার আমলের রেল ব্যবস্থাপনাসহ কর্মীদের গাফিলতি ও নানাবিধ অনিয়ম তো রয়েছেই। ফলে রেল লোকসান থেকে লাভের মুখ দেখতে পায়নি। বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা। অথচ নব্বইয়ের দশকে ৫ ঘণ্টায় এ পথে যাতায়াত করা যেত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টপেজ ক্রমেই বাড়ানোয় আন্তঃনগর ট্রেন এখন অনেকটাই লোকাল ট্রেনে পরিণত হয়েছে। ট্রেনের টিকিট বিক্রিতেও কোটা ব্যবস্থা ও কালোবাজারি বন্ধ হয়নি। এ কারণে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও এসি ও প্রথম শ্রেণির বগি প্রায়ই খালি যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছর এই দুই শ্রেণির বগিগুলোয় মাত্র ৪২ ও ৬৬ শতাংশ যাত্রী ছিল। আবার রেলওয়ের সেতুগুলোর প্রায় অর্ধেক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেগুলো মেরামত অথবা পুনর্র্নিমাণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলমান ৬৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে লোকসান কমে আসবে। ২০১৮ সালের মধ্যে রেলের উন্নতি আরো দৃশ্যমান হবে। এত অনিয়ম, দুর্নীতির বিশৃঙ্খলার পরও ২০২০ সালের মধ্যে রেলের চেহারা পাল্টে যাবে বলে দাবি করেছেন বর্তমান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক যদিও মুজিবুলহক আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধেই সকল অনিয়মের অভিযোগের তীর। হরিলুটের আরো কিছু চিত্র রেলের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি-অপচয়ের অন্যতম উদাহরণ চীন থেকে কেনা ২০ সেট ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেন। তিন ইউনিটবিশিষ্ট এ ট্রেনগুলো কেনায় ৬৮৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এক্ষেত্রে অন্তত ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া নকশায় ত্রুটির কারণে নিয়মিতই ডেমু ট্রেনগুলো নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। আর অসহনীয় ভোগান্তির কারণে ডেমু ট্রেনে কেউ ভুল করে একবার যাত্রী হলেও দ্বিতীয়বার ভুলেও আর উঠেন না। এ কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছেন। অপরদিকে, ব্যবহারের আগেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণে কেনা তেলবাহী ১৬৫টি ব্রড গেজ ও ৮১টি মিটার গেজ ট্যাংকার। তেল প্রবেশ ও নির্গমন মুখ সরু হওয়ায় এসব ট্যাংক ওয়াগনে জ্বালানি তেল পরিবহনে রাজি নয় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা-এ তিন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। অথচ জ্বালানি পরিবহনক্ষমতা বাড়াতে ২০৯ কোটি টাকায় ওয়াগনগুলো কেনে রেলওয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ে ভারত থেকে ১০টি ব্রড গেজ ইঞ্জিন কেনা হয়। এগুলো কেনায় ভ্যাটসহ ব্যয় হয়েছে ৩৬৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারদর যাচাই করে এক্ষেত্রে ২০৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছিল খোদ রেলওয়ে। লুটপাট প্রবণতার কারণেই সেই দর অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি পরবর্তীতে আবারও ওই অস্বাভাবিক দরে ভারত থেকে আরো ১৬টি ইঞ্জিন কেনা হয়েছে। এতে রেলওয়ের গচ্চা গেছে ২৮৫ কোটি টাকা। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা নদীর ওপর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলসেতু নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। খোদ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগই (আইএমইডি) এর প্রমাণ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করে সংস্থাটি। আইএমইডির মতে, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে দুর্বল করে তৈরি করা হয় এই সেতু। ঢালাই কাজে ব্যবহার করা হয় পলি মিশ্রিত বালি। আর নিম্নমানের পাতলা ও ভঙ্গুর পাথর। ফলে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে সেতুর ঢালাই কাজ। সেতুটির এক্সপানশন জয়েন্ট একই লেভেলের হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে সেতুটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলে অসুবিধা ঘটবে। দুবছর আগে আইএমইডি বিষয়টি অতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে ২ মাসের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রেল মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ৩০ মাসে সেতুটির নির্মাণ শেষ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে বাড়ানো হয় নির্মাণের মেয়াদকাল। সবশেষ গত বছরের ৯ নভেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের নামে নামকরণ করে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। যদিও উদ্বোধনের আগে গত অক্টোবরে নবনির্মিত সেতুটিতে ফাটল দেখা দেয়। এ সময় নদীতে ৮/৯/১০ নম্বরের তিনটি পিলারের সাইড ভেঙে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল এই সেতু নির্মাণে অনিয়ম আর নির্মাণ কাজে ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ায় এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়কে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) প্রেরণ করেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইএমইডির মহাপরিচালক ও উপপরিচালকের নেতৃত্বে একটি দল ২০১৬ এর অক্টোবরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি ২০১৭ এর শুরুর দিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির সচিত্র প্রতিবেদন পাঠায়। এতেই অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। এর পর ফাটল দেখা দেয়ায় অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ভৈরব সেতুটি। এরই ভিত্তিতে পরিকল্পনামন্ত্রী ডিও লেটার পাঠান বলে জানা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তে রেলপথ মন্ত্রণালয় গত বছরের শেষের দিকে একটি কমিটিও গঠন করে। কিন্তু তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি, ফলে কাউকেই শাস্তি পেতে হয়নি। রেলসূত্রে জানা গেছে, ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণের (এলওসি) আওতায় সেতুটি নির্মাণ করেছে ভারতের ইরকন-এফকনস জেভি। এজন্য ব্যয় হয় ৫৬৭ কোটি ১৬ লাখ টাকারও বেশি। কালো বিড়ালের কী হলো? সারা জীবন নীতিকথা আওড়িয়ে মন্ত্রীত্ব পেয়েই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জড়িয়ে পড়েছিলেন দুর্নীতিতে। ২০১২ এর ৯ এপ্রিল, রাত ১১টা। রাজধানীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দফতরের মূল ফটক দিয়ে হঠাৎ ফটকে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গাড়ি ভেতরের দিকে চলে গেল কিছুদূর। । নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়িতে তল্লশি করে উদ্ধার করেন ৭০ লাখ টাকা। সাথে আটক করেন চালকসহ গাড়িতে থাকা আরও তিনজনকে। তারা হলেন- সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক ও রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাপরিচালক ইউসুফ আলী মৃধা ও কমান্ডেন্ট এনামুল হক। গণমাধ্যমের সুবাদে মুহূর্তে তা জেনে যায় জাতি। ২০১২ সালজুড়ে এ ঘটনাটি ছিল সবার মুখে মুখে। এর আগে ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের আলো ঝলমলে পরিবেশে শপথ নিতে যাওয়া কয়েকজনের মুখ ছিল বেশ উজ্জ্বল। কিছুক্ষণ পরে শপথ অনুষ্ঠান। দরবার হলের অপেক্ষা শেষ করে রাষ্ট্রপতি নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের শপথ পড়াচ্ছেন। এ শপথের বাইরেও নবনিযুক্ত রেলমন্ত্রী একটু আগ বাড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রেলওয়েতে দুর্নীতির কালো বিড়াল ঢুকেছে। আমার প্রথম কাজ হবে এ কালো বিড়ালকে তাড়ানো।’ ২০১২ এর জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে সুরঞ্জিত সেন বলেন, রেলের দুর্নীতির হোতা- ‘কালো বিড়ালদের’ খুঁজে বের করতেই হবে। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের তিন মাস না যেতেই রেলের ওয়েম্যান ও খালাসিসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। চাকরি দেয়ার নামে প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতি পদের বিপরীতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। এই টাকার সিংহভাগ যেত সরাসরি রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পকেটে। মন্ত্রী হয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন রেলের কালো বিড়াল ধরবেন। রেলকে বাঁচাবেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ‘কালো বিড়াল’ ধরতে গিয়ে মন্ত্রী নিজেই কালো বিড়াল হয়ে ধরা খেয়ে গেলেন। পরে মন্ত্রীর পদও হারাতে হলো তাকে। বিজিবির হাতে আটক ড্রাইভার আলী আজমের তথ্য মতে, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে নিয়োগ বাণিজ্যের টাকার ভাগের অংশ রেলমন্ত্রীকে পৌঁছে দিতেই চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়। ঘটনার প্রায় ৬ মাস পর ২০১২ সালের ৬ অক্টোবর ড্রাইভার আলী আজম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, টাকা যাচ্ছিল সুরঞ্জিতের বাড়িতে। তার বক্তব্য- শুধু ওইদিনই নয়, এর আগেও বেশ কয়েকবার তার গাড়িতে করে মন্ত্রীর বাড়িতে ঘুষের টাকা নেয়া হয়েছে। আজম খান দাবি করেছেন, সেই ৭০ লাখ টাকা মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাড়িতেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, রেলে নিয়োগের জন্য ঘুষ হিসেবে। আজম খান জানান, রেলের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও মন্ত্রীর এপিএস ফারুকের মধ্যে কন্টাক্ট হয়েছিল তারা মন্ত্রীকে ১০ কোটি টাকা দেবেন। আর রেলে ৬০০০ লোক ঢুকাবে। পরে দুদক তদন্ত করে এর প্রমাণ পায়। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীকে বাঁচিয়ে দেয়া হলেও রেলের জিএম ইউসুফ আলী মৃধাসহ অভিযুক্ত ৩ জনের বিরুদ্ধে সাতটি মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে দুদক। মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন। ঢাকা-পায়রা প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি এদিকে রেলের বর্তমান মন্ত্রী মুজিবুল হকের দায়িত্বগ্রহণের পর সেই দুর্নীতির কালো বিড়াল আরও মোটাতাজা হয়েছে। অবাক হলেও সত্য যে, শুরুতে এ প্রতিষ্ঠানটির মূলধন ছিল ১শ’ পাউন্ড বা ১০ হাজার টাকা মাত্র। এরকম একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের। ২০১৬ এর ২০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরও করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সূত্র বলছে, প্রকল্পের প্রাক্কলিত দরের চিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। যেমন- ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের খরচ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা। অথচ দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল ট্র্যাকের লাইন, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামোসহ প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে খরচ হয় সর্বোচ্চ ২৩ কোটি থেকে ৩১ কোটি টাকা। সূত্রমতে, ১৮ মাস সময়ের মধ্যে তারা সমীক্ষার কাজ শেষ করে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা। ডিপি রেলের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা কর্মকর্তা রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকঠামো) কাজী রফিকুল আলম সম্প্রতি বলেছেন, ‘এটি সাময়িক একটি সমঝোতা স্মারক। যুক্তরাজ্যের ডিপি রেলওয়ে কোম্পানি এ সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে শুধু প্রাথমিক সমীক্ষা করছে।’ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ডিপি রেলের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২৪ সাল নাগাদ রেলপথ নির্মাণের কাজ শেষ হবে। ২০১৬ এর ৯ আগস্ট একনেক সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। লাগামহীন ব্যয়ে প্রশ্ন রেলপথ মন্ত্রণালয় চার প্রকল্পের আওতায় মোট ৩৫৪ দশমিক ১৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পে কিলোমিটার প্রতি রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ে রয়েছে বিরাট অস্বাভাবিকত্ব। এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে কোথাও ব্যয় হচ্ছে ১৪ কোটি, আবার কোথাও ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি টাকা। ২০১৭ এর ডিসেম্বরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে উপস্থাপিত রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে নির্মাণ ব্যয়ে বড় তারতম্যের এই চিত্র উঠে এসেছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কাছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক প্রতিবেদন চেয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের অধীনে একটি সমাপ্ত ও চারটি চলমান প্রকল্পের ব্যয়ের চিত্র উপস্থাপন করে। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও চীনের রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটির বৈঠকে জানানো হয়। কমিটির সদস্যরা পরবর্তী বৈঠকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তথ্যসহ প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালার চর নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ৮৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথের নির্মাণ ব্যয় ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু খুলনা থেকে মংলা পোর্ট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের আরেকটি প্রকল্পে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ধরা হয় ৪৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা।